top of page
Search
  • Dr. Dibyendu Hazra

কোয়ান্টাম কম্পিউটার: দ্বিতীয় পর্ব



যারা প্রথম পর্বের লেখাটি পড়েনি, তাদের অনুরোধ ওই লেখাটি চোখ বোলাতে। ওই পর্বে আমরা মূলত আলোচনা করেছিলাম সাধারণ কম্পিউটার কি-ভাবে কাজ করে এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটারের কাজ করার মূল রীতিনীতিগুলি কি– তাই নিয়ে। এই পর্বে আমরা কোয়ান্টাম কম্পিউটারকে ঐতিহাসিক পটভূমি থেকে জানার চেষ্টা করেছি ও কোয়ান্টাম কম্পিউটারের কিছু মূল বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। এছাড়া ছাত্রছাত্রীদের কথা মাথায় রেখে, কোয়ান্টাম কম্পিউটার থেকে কি-ভাবে কর্মসংস্থান হচ্ছে এবং কোন বিষয়গুলো জানলে কোয়ান্টাম কম্পিউটার এবং কোয়ান্টাম প্রযুক্তির কাজে যোগদান করা যাবে, সে-নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। অনেক জায়গাতেই বেশ কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে আগ্রহী পাঠকেরা আরো খোঁজ খবর নিতে পারেন। কোয়ান্টাম কম্পিউটার সম্বন্ধে ভবিষ্যতে আরো খুঁটিনাটি জানতে, আগ্রহী পাঠকদের, লেখকের বিজ্ঞান সংক্রান্ত ইউটিউব চ্যানেলটিতে চোখ রাখার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে।


প্রাককোয়ান্টাম যুগের বিয়োগ গাথা

এ-সব অনেকদিন আগেকার কথা। সময়কাল— ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ আর বিংশ শতাব্দীর শুরু। মৃত্যুর প্রায় দেড়-দুশ বছর হতে চলল, অথচ স্যার আইজ্যাক নিউটনের মতো বিজ্ঞানী আর জন্মাল না। বিশেষ করে তাঁর দেওয়া দ্বিতীয় গতিসূত্র তো একেবারে জাদুর মতো। একটি বস্তুকণার উপর বাইরে থেকে কি বল প্রযুক্ত হচ্ছে আর শুরুতে বস্তুকণা কি অবস্থায় আছে তা জানা থাকলে, সেই বস্তুকণার ভূত-ভবিষ্যৎ অঙ্ক কষে বলার মন্ত্র লুকিয়ে আছে এই দ্বিতীয় গতিসূত্রের মধ্যে। আর এই দ্বিতীয় গতিসূত্রকে কেন্দ্র করে বিজ্ঞানের যে শাখা গজিয়ে উঠেছে তাই আজকাল নিউটোনিয়ান বা ক্লাসিক্যাল বিজ্ঞান নামে পরিচিত। এই ক্লাসিক্যাল বিজ্ঞান দিয়েই সব চলছিল বিগত দুশ বছর। কিন্তু বাধ সাধল এই সময়ে— ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ আর বিংশ শতাব্দীর প্রথম দু-তিন দশকে (মোটামুটি ১৮৯০ থেকে ১৯৩০ সালের মাঝের সময়কালে )। উন্নত প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বেশ কিছু হাতে-কলমে পরীক্ষা করা হলো এই সময়। যেমন, কৃষ্ণ পদার্থের বিকিরণ, আলোকবৈদ্যুতিক প্রভাব, কম্পটনের গবেষণা, ইত্যাদি। এছাড়া, বিভিন্ন অণু পরমাণুর বর্ণচ্ছটার (অ্যাটমিক এন্ড মলিকুলার স্পেক্ট্রা) মূল্যায়ন করা হলো। দেখা গেলো ক্লাসিক্যাল বিজ্ঞান দিয়ে এসব ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। বিজ্ঞানীরা পড়লেন মহাসংকটে। নিউটনের গতিসূত্র, যা এত শতাব্দী ধরে সব মিলিয়ে দিচ্ছিল, তা এই সব হাতে কলমের পরীক্ষালব্ধ ফলাফলকে মেলাতে পারছে না— ব্যাপারটা কি! পদার্থ বা রসায়নবিজ্ঞান হলো পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান। এখানে তত্ত্ব (থিওরি) নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, তবে যেকোন তত্ত্বকে হাতে কলমের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে, তবেই তা প্রকৃতপক্ষে মান্যতা পাবে।


সে সময়ের সব তাবড় তাবড় বিজ্ঞানীরা মাথা ঘামাতে শুরু করলেন। এটা ক্রমশঃ পরিষ্কার হতে লাগলো যে, অণু -পরমাণু স্তরে চলে গেলে, সেখানে যে-সব বৈজ্ঞানিক ঘটনা ঘটছে, ক্লাসিক্যাল বিজ্ঞান দিয়ে সে-সবের ব্যাখ্যা করা যাবে না। প্রয়োজন নতুন কিছু ধ্যান ধারণা। এই নতুন ধ্যান ধারণার নামই হলো কোয়ান্টাম মেকানিক্স।


কোয়ান্টামের যাত্রা শুরু

এখন প্রশ্ন, তা-হলে কি কোয়ান্টাম মেকানিক্স রাতারাতি দুম করে আবিষ্কার হলো? নিউটনের, গাছ থেকে আপেল পড়ার, 'গল্পের' মতোই কি কোনো একজন বেদানার রস খেতে খেতে, তার ছোট্ট ছোট্ট দানা দেখে ভাবলেন, শক্তি এমন দানাদার 'কোয়ান্টার' মতো, আর আবিষ্কার হয়ে গেলো কোয়ান্টাম মেকানিক্স? উত্তর হচ্ছে, না। কোনো একজন না, একাধিক বিজ্ঞানীর বৈপ্লবিক ও যুগান্তকারী চিন্তাধারার সম্মিলিত ফল কোয়ান্টাম মেকানিক্স। আর এই কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মূল ভিত্তি প্রস্তর করতে লেগে গিয়েছিল প্রায় তিরিশ চল্লিশ বছর, মোটামুটি ১৯৩০ সাল অবধি। এর মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বড় কাজটি হয়েছিল ১৯২৫-২৬ সালে, যখন শ্রোয়েডিঙ্গার তার বিখ্যাত সমীকরণটি নিয়ে হাজির হলেন, যা আজ শ্রোয়েডিঙ্গার ইকুয়েশন নামে পরিচিত। এটা ক্রমশঃ প্রকাশ্য হতে লাগলো যে, আণুবীক্ষণিক স্তরে গিয়ে কোনো কিছু বুঝতে, নিউটনের দ্বিতীয় গতিসূত্র সহায়ক হবে না, কাজে লাগাতে হবে শ্রোয়েডিঙ্গার ইকুয়েশন। এর সাথে, শ্রোয়েডিঙ্গার ইকুয়েশন থেকে উপজাত বিষয়গুলির ব্যাখ্যা ও তাৎপর্যের কাজ এগোতে লাগলো। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে কি-ভাবে শ্রোয়েডিঙ্গার ইকুয়েশন ও কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অন্যান্য প্রকল্প ও সিদ্ধান্তকে কাজে লাগাতে হবে, সে-সব গঠনতন্ত্রও ধাপে ধাপে নির্মিত হলো। কোয়ান্টাম ও অকোয়ান্টাম

এখানে, আংশিক প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে কয়েকটি কথা না বললেই নয়। অনেকের মধ্যে একটা ধারণা কাজ করে যে, কোয়ান্টাম মেকানিক্স কেবলমাত্র ছোট, মানে আণুবীক্ষণিক জিনিসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; বড় আকারের জিনিসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এ-ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। কোয়ান্টাম মেকানিক্স সবক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তবে অনেক ক্ষেত্রেই, ক্লাসিকাল মেকানিক্সের নীতি প্রয়োগ করে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের প্রায় সমতুল্য ফল পাওয়া যায়।


যেমন, আমার হাতে একটা ক্রিকেট বল আছে। উপরের দিকে ছুঁড়ে দিলাম। প্রাথমিক গতিবেগ জানা থাকলে বলটি কত উঁচুতে উঠবে তা জানতে ক্লাসিকাল মেকানিক্সই যথেষ্ট। কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর নীতি প্রয়োগ করলে হয়তো আরো নিঁখুত উত্তর পাওয়া যাবে, তবে সেটি করতে অনেক বেশি অংক কষতে হবে, যা একেবারে মশা মারতে কামান দাগার মতো— বাস্তবিক অর্থে নিষ্প্রয়োজন।


কেন কোয়ান্টাম মেকানিক্স মায়াময়?

ক্লাসিকাল মেকানিক্সের মতোই, অনেক ক্ষেত্রে — যেমন একটি বাক্সে একটি কণা আবদ্ধ থাকলে, বা সরল দোল গতির সমস্যা — কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অংকও খুব জটিল নয়। তা- হলে, কোয়ান্টাম মেকানিক্স বুঝতে বা অনুধাবন করতে সমস্যা কোথায়? আমার ধারণা, এর মূল সমস্যা একেবারে গোঁড়াতে। ক্লাসিকাল মেকানিক্সের শুরুটা হয়, বাইরে থেকে প্রযুক্ত বল (বা সেই বলের সমতুল্য বিভব বা পোটেনশিয়াল) খোঁজার মধ্যে দিয়ে । হীরকরাজার মূর্তি উৎপাটনের সময় নিরবচ্ছিন্ন 'টান বল', বা মাথায় চাঁটি মারার সময় ঘাতবল (ইম্পালসিভ ফোর্স), বা পিছল খেয়ে পড়ে যাবার সময় ঘর্ষণ বলের অভাব — সহজেই অনুধাবন করা যায়।


কিন্তু কোয়ান্টামের ক্ষেত্রে, শুরুতেই একটি তরঙ্গঅপেক্ষক (ওয়েভফাঙ্কশন) বসে থাকে, যার অন্তর্নিহিত অর্থ অনুধাবন করা কষ্টসাধ্য, বিশেষ করে এটি জটিল অপেক্ষক (কমপ্লেক্স ফাঙ্কশন ) বলে। এছাড়া, উপরিপাতনের নীতি (সুপারপজিশন প্রিন্সিপল), কোনোকিছু মাপার সময় তরঙ্গ অপেক্ষকের (ওয়েভ ফাঙ্কশন) ধসে যাওয়া (কোলাপ্স করা ), কোয়ান্টাম গাঁটছড়া (এন্টেঙ্গেলমেন্ট ) — এসব দৃষ্টিগোচর করা বেশ কঠিন। নিউটনের বিড়াল মেউমেউ করে ডাকে বা চুপ থাকে কিন্তু শ্রোডিঙ্গারের বিড়াল একই সাথে মেউমেউ করতে ও চুপ থাকতে পারে। সাধে কি-আর রিচার্ড ফাইনম্যান বলেছিলেন — কেউ কোয়ান্টাম মেকানিক্স বোঝে না (নো ওয়ান আন্ডারস্টান্ডস কোয়ান্টাম মেকানিক্স)!


কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর খুঁটিনাটি বোঝার লোক হাতেগোনা হলেও, আশার কথা এই যে, বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ঘটনার ব্যাখ্যায় কোয়ান্টাম মেকানিক্স কি-ভাবে প্রয়োগ করতে হবে, তা বিজ্ঞানীরা ধীরেধীরে বের করেছেন ও তার প্রণালীও (রেসিপি) সুন্দর করে লিপিবদ্ধ করা আছে বিভিন্ন পুস্তকে। তা-দিয়েই কার্যকর বহু কিছু করা সম্ভব। উপমা হিসাবে বলা যায়, বিরাট কোহলি যখন ছক্কা মারেন বা সাকিব-আল -হাসান যখন স্পিন বোলিং এ সবাইকে ধরাশায়ী করেন, তখন তাঁরা সম্ভবত জানেন না যে তাঁরা কত নিউটন বল বা কি পরিমাণে টর্ক প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু ব্যাটবল হাতে পেলে কার্যকরী যা-কিছু করা সম্ভব তা তাঁরা করে দেখান। একইভাবে, তরঙ্গ অপেক্ষক (বা বিকল্প হিসাবে হামিল্টনীয়ান) আন্দাজ করতে পারলে, সেই তন্ত্রের (সিস্টেম) অনেক কিছু অঙ্ক কষে বের করা সম্ভব— তা কোয়ান্টাম-এর দর্শন যতই জটিল হোক না কেন। (প্রশ্নঃ যদি কোনো সিস্টেমে ক্ষয়কারী বল, যেমন ঘর্ষণ, থাকে সে-ক্ষেত্রে কি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নীতি প্রয়োগ করা যায়?)


কোয়ান্টাম ও কোয়ান্টাম কম্পিউটার


সে যাই হোক, গোড়াতে, কোয়ান্টামের ধারা তার নিজের গতিতেই প্রবাহিত হয়েছে। কোয়ান্টাম কম্পিউটার বানাবার কোনো দায় বা তাগিদ নিজের মাথায় নিয়ে কোয়ান্টাম মেকানিক্স তার যাত্রা শুরু করে নি, বা যাত্রাপথ বেছে নেয় নি। আর সেটা বেশ বোঝা যায় কোয়ান্টাম মেকানিক্স আর কম্পিউটার — এদের বিবর্তনের সময়কাল দেখলে। ১৯৩০ বা ৪০ সাল নাগাদ, যখন কোয়ান্টাম মেকানিক্স মোটামুটিভাবে নিজের জায়গা আধুনিকতম বিজ্ঞানের আসনে পাকা করে নিয়েছে, তখনও সেই অর্থে কোয়ান্টাম কম্পিউটার তো দুরস্ত, সাধারণ কম্পিউটারই বা কোথায়? সাধারণ কম্পিউটারের জন্মলগ্ন দেখতে গেলে সেই অর্থে ১৯৪০ শের দশক, মানে কোয়ান্টামের জন্মের প্রায় চার দশক পরে।

আর কোয়ান্টাম কম্পিউটারের কথা প্রথম উত্থাপিত হয় ১৯৮০ র দশকে। (প্রশ্নঃ কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ধারণার জনক বা জননী কে বা কারা?) প্রস্তাব করা হয়, এমন কম্পিউটার বানাবার, যার মূল দর্শনটাই হবে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের উপর ভিত্তি করে। কারণ জগৎবিশ্ব কোয়ান্টামের নীতি মেনে চলে। তাই দেখা যায় সিস্টেম একটু জটিল হতে থাকলে সাধারণ কম্পিউটার আর সেই সিস্টেমের খুঁটিনাটি বাগে আনতে পারে না। একটা কফির দানার খুঁটিনাটি অংক কোসে দেখতে যে পরিমান কম্পিউটার মেমোরি লাগবে, তা পৃথিবীতে যত পরমাণু আছে তার চেয়েও বেশি। তাই সাধারণ কম্পিউটার দিয়ে তা হবে না।

পুনরাবৃত্তি করেই বলছি, এই কোয়ান্টাম কম্পিউটারকে কোনোভাবেই সাধারণ কম্পিউটারের একটা উন্নততর সংস্করণ হিসাবে ভাবাটা ঠিক নয়। মানে, আমি যদি কোনো app কে, যেমন হোয়াটস্যাপ, কোয়ান্টাম কম্পিউটারে চালাই, সে আরো তাড়াতাড়ি চলবে, বা কোয়ান্টাম কম্পিউটারে .mp ফরমেটের ''গুপিগাইন বাঘাবাইন'' চালালে ছবি ও শব্দের (পিকচার এন্ড সাউন্ড কোয়ালিটি) গুণমান বেড়ে যাবে— এমন তো নয়ই, বরং এগুলো কোয়ান্টাম কম্পিউটারে চালানো সম্ভব নয়। কারণ, এগুলোর ভাষা (এলগোরিদম ) কোয়ান্টাম কম্পিউটার পড়তেই জানে না। কোয়ান্টাম কম্পিউটারের পড়ার জন্য দরকার কোয়ান্টামের ভাষা বা কোয়ান্টাম এলগোরিদম। তাই, এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে, বিজ্ঞানীরা মোটামুটি একমত যে, যে-সব কাজ সাধারণ কম্পিউটার অবলীলায় বা বেশ দক্ষতার সাথে করে, সে-সব কাজে কোয়ান্টামের নাক গলাবার দরকার নেই। বরং সে সমস্ত কাজই কোয়ান্টাম কম্পিউটার করুক, যা সাধারণ কম্পিউটারের পক্ষে করা প্রায় অসম্ভব এবং কোয়ান্টামের পক্ষে তুলনামূলক "সহজভাবে" সম্ভব। (প্রশ্নঃ কোন্ ক্ষেত্রগুলিতে মনে করা হচ্ছে কোয়ান্টাম কম্পিউটার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে?)


কোয়ান্টাম বিটের দু-চারকাহন

প্রথম পর্বের লেখায় বলেছিলাম যে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের মূল উপাদান হলো কোয়ান্টাম বিট। এখন প্রশ্ন, এই কোয়ান্টাম বিট বানানো হয় কি দিয়ে? এক কথায় বলতে গেলে কোয়ান্টাম বিট বানানো হয় বিভিন্ন ধরণের "কোয়ান্টাম সিস্টেম" বা "কোয়ান্টাম বস্তু (কোয়ান্টাম অবজেক্ট)" দিয়ে। "কোয়ান্টাম সিস্টেম" বা "কোয়ান্টাম বস্তু" কি জিনিস? সহজ ভাবে বলতে গেলে, এ এমন জিনিস যার "কোয়ান্টাম ধর্ম (প্রপার্টি )" আছে বা যারা "কোয়ান্টাম দশায় (কোয়ান্টাম স্টেট)" থাকতে পারে। "কোয়ান্টাম ধর্ম " বা "কোয়ান্টাম দশা" কি জিনিস? এ এমন ধর্ম বা দশা যা "ক্লাসিক্যাল" বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। যেমন, ইলেক্ট্রনের "স্পিন" বা আলোর "ফক স্টেট।" এমনি, আরো অনেক আছে।


কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এর প্রথম ধাপ হচ্ছে একটি উপযুক্ত কোয়ান্টাম বস্তু ও সংশ্লিষ্ট কোয়ান্টাম দশা খুঁজে বের করা। এরপর, কোয়ান্টাম বস্তুকে সংশ্লিষ্ট কোয়ান্টাম দশায় নিয়ন্ত্রণ করা (স্টেট প্রিপারেশন)। পরিশেষে, কোয়ান্টাম বস্তুর ভেলকি দেখানো (কম্পিউটিং) হয়ে গেলে, তথ্য সংগ্রহ করা ও কোয়ান্টাম বস্তুকে আবার তার কোয়ান্টাম দশায় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা।


তবে ঝামেলা একগাদা। কোয়ান্টাম বস্তুকে কোয়ান্টাম দশায় ধরে রাখাটাই অনেক বিপত্তির। কারণ কোয়ান্টাম দশাকে বাইরে থেকে যথেষ্ট বিচ্ছিন্ন করতে না পারলে কোয়ান্টাম ধর্মের বারোটা বেজে যায় (উপমা হিসাবে, ফ্রিজের দরজা খোলা রাখলে যেমন ফ্রিজের বরফ গলে যায় তেমনি)। এই বিচ্ছিন্ন করাটা বেশ জটিল ও ব্যয়সাধ্য ব্যাপার। আবার সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিলে মুশকিল, সেটিকে নিয়ন্ত্রণ ও সেখান থেকে তথ্য আহরণ করা যাবে না (উপমা হিসাবে, ফ্রিজের দরজা মাঝে মাঝে না খুললে জিনিস পত্র ঢোকানো ও বের করা যাবে না যে। তা-হলে ফ্রিজ কিনে কি লাভ?)। বাইরের জগতের সাথে অবিচ্ছিন্নতা এবং নিয়ন্ত্রণ ও তথ্য আহরণের সময় কোয়ান্টাম দশার বেহাল হওয়াটাকে বলা হয় বিকোয়ান্টায়ান (কোয়ান্টাম ডি কোহেরেন্স)। কোয়ান্টাম বিটের কোয়ান্টায়ান কাল (কোহেরেন্স টাইম) কিভাবে বাড়ানো যায়, তাই নিয়ে এখনো বিস্তর গবেষণা চলেছে। (প্রশ্ন: এখনও পর্যন্ত দীর্ঘতম কোয়ান্টায়ান কাল বা কোহেরেন্স টাইম কত অবধি বিজ্ঞানীরা নিয়ে যেতে পেরেছেন?)


এতো শুধু একটা কোয়ান্টাম বিটের কথা বললাম। সেটিকে বাগে আনতেই এত কাঠখড় পোড়াতে হয়। বাস্তবে, কাজের কাজ করতে হলে হাজার-হাজার অথবা লক্ষ-লক্ষ কোয়ান্টাম বিটকে একসাথে, একে অপরের সাথে সামঞ্জস্য রেখে, কাজ করতে হবে। বর্তমান কোয়ান্টাম কম্পিউটার গবেষণার একটা বড় কাজ তাই মাথা খাটিয়ে বের করা — কি-ভাবে হাজার-হাজার লক্ষ-লক্ষ কোয়ান্টাম বিটকে এক ছাদের তলায় নিয়ে আসা যায়। (প্রশ্নঃ বর্তমানে সর্বোচ্চ কত কোয়ান্টাম বিটকে কোনো কোয়ান্টাম কম্পিউটারে ব্যবহার করতে বিজ্ঞানীরা সমর্থ হয়েছেন? কোন প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি এ-কাজ করেছে?)



কর্মসংস্থান করতে কোয়ান্টাম কম্পিউটার আজকের দিনে প্রায় প্রত্যেকটা নামি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোয়ান্টাম কম্পিউটার নিয়ে পড়াশুনো ও গবেষণার কাজ হচ্ছে। কোয়ান্টাম প্রযুক্তির জন্য আলাদা করে বিভাগও তৈরী হচ্ছে। তবে, সবথেকে আশার কথা, বিগত দু-দশকে, বিশেষ করে বিগত আট দশ বছরে, বহু নামি কোম্পানি কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরী করতে নেমে পড়েছে। এদের মধ্যে কয়েকটি হলো আই বি এম, গুগল, মাইক্রোসফট, ইনটেল, এবং আমাজন। শুধু তাই নয়, উন্নত দেশগুলিতে, প্রায় প্রত্যেক বছর অনেক নতুন কোম্পানি (স্টার্ট আপ) তৈরী হচ্ছে কেবলমাত্র কোয়ান্টাম কম্পিউটার বানাবার লক্ষ নিয়ে, যেমন কানাডার জানাডু এবং ফিনল্যান্ডের আইকিউএম। সব মিলে প্রায় শতাধিক কোম্পানি আজ কোয়ান্টাম কম্পিউটার ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির সাথে যুক্ত। (প্রশ্নঃ ভারত বা বাংলাদেশে কোয়ান্টাম কম্পিউটার বানাবার চেষ্টা কি কোনো কোম্পানি করছে? করলে কারা? কোয়ান্টাম কম্পিউটার বানাবার প্রচেষ্টা থেকে সব মিলে সারা বিশ্বে আনুমানিক কত লোকের প্রত্যক্ষ কর্ম সংস্থান হচ্ছে? সব মিলে কোয়ান্টাম কম্পিউটার এর কাজে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ কত?)


কোন্ বিষয়গুলো জানতে হবে? এখন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের কথা মাথায় রেখে আলোচনা করা যাক, কোয়ান্টাম প্রযুক্তিতে কাজ পেতে গেলে বা অবদান রাখতে হলে, কোন্ বিষয়গুলো সম্বন্ধে জানতে হবে! প্রথমেই বলে রাখা ভালো যে, নিম্নে আলোচিত সব বিষয়েই যে পান্ডিত্য থাকতে হবে তার কোনো মানে নেই, বরং যে-কোন একটি বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা থাকলেই কাজ চলবে। প্রথমে একটা সহজ উপমা দেওয়া যাক। ধরা যাক, সাড়ে তিন হাজার লোকের জন্য ইলিশ মাছের বিরিয়ানি রান্না করতে হবে। যাঁর রান্নার মূল দায়িত্ব, সেই ঠাকুর বা খাসনবিশ, এই বিরাট প্রকল্প বা কর্মযজ্ঞকে সম্ভবত কয়েকটা ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে নেবেন। তিনি একজনকে খুঁজবেন যে খুব ভালো পেঁয়াজ কাটেন, আর এক জনকে খুঁজবেন যিনি মাছের আঁশ খুব ভালো ছাড়ান, ইত্যাদি। এখন হতেই পারে পেঁয়াজ বা মাছ বিশেষজ্ঞ হয়তো বিরিয়ানি রান্না, তার মশলা এবং রন্ধন শিল্প সম্বন্ধে একেবারেই অবগত নন, কিন্তু সামগ্রিক বিরিয়ানি যজ্ঞে নিজেদের জায়গা থেকে তাঁরা অমূল্য অবদান রেখে যেতে পারেন। একই ভাবে, যারা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ভাষা জানেন এবং সেটাকে কাজে লাগিয়ে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং নিয়ে পড়াশুনা করছেন, তারা কোয়ান্টাম প্রযুক্তিতে অবদান রাখতে পারবেন। কোয়ান্টাম হার্ডওয়্যার বানাতে ন্যানোপ্রযুক্তি বা ন্যানোখননের (ন্যানো ফ্যাব্রিকেশন) এর জ্ঞান লাগে। তাই যারা ন্যানো ফ্যাব্রিকেশন নিয়ে পড়াশুনা করছে এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি নিয়ে যারা ঘাঁটাঘাঁটি করেন, তারাও সুযোগ পাবে। বেশিরভাগ কোয়ান্টাম হার্ডওয়্যারকে ঠাণ্ডা করতে হয় প্রায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রার কাছাকাছি। তাই যারা নিম্নতাপমাত্রার প্রযুক্তি (ক্রায়োজেনিক্স) নিয়ে পড়াশুনা করছে তাদের সুযোগ থাকবে। অধিকাংশ কোয়ান্টাম হার্ডওয়্যার বানানো হয় অতিতড়িৎপরিবাহী (সুপারকন্ডাক্টার) পদার্থ দিয়ে। তাই যারা সুপারকন্ডাক্টার নিয়ে কাজ করে, তাদের সুযোগ থাকবে। অনেক কোয়ান্টাম হার্ডওয়্যারকে বাগে আনতে (ম্যানিপুলেট করা), মাইক্রোওয়েভ কাজে লাগাতে হয়। তাই মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তি নিয়ে যারা পড়াশুনা করছে, তারাও সুযোগ পাবে। এছাড়া যে সব পদার্থ দিয়ে কোয়ান্টাম হার্ডওয়্যার বানানো হয়, তাদের ইলেক্ট্রিক্যাল এবং অন্যান্য ধর্ম (মেটিরিয়াল প্রপার্টিস) জানতে হয়। ফলে যারা ইলেক্ট্রিক্যাল ট্রান্সপোর্ট বা মেটিরিয়াল সায়েন্স নিয়ে লেখাপড়া করছে, তাদের সুযোগ থাকবে। এ-ছাড়া, অন্যান্য যে-কোন বিজ্ঞান বিষয়ের মতই, কম্পিউটার প্রোগ্রামিং যারা ভালো করতে পারে, তাদের আছে বিরাট সুযোগ। সাম্প্রতিক কালে কিছু কোম্পানি, যেমন কানাডার জানাডু, ফোটোনিক পদার্থ দিয়ে কোয়ান্টাম কম্পিউটার বানানোর চেষ্টা করছে। তাই যারা ফোটোনিক্স নিয়ে পড়াশুনা করছে, তাদেরও সুযোগ থাকছে। (প্রশ্নঃ আর কোন্ বিষয়গুলি এখানে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে?)

পরিশেষে

এই লেখাটি আর দীর্ঘায়িত করছি না। কোয়ান্টাম কম্পিউটার নিয়ে যে টুকরো টুকরো আলোচনা হলো, তার এক একটি বিষয় নিয়ে, আরো গভীরে আলোচনা করার ইচ্ছা প্রবন্ধাকারে ও ইউটিউব চ্যানেলে রইলো। কোয়ান্টাম কম্পিউটার ও কোয়ান্টাম প্রযুক্তি নিয়ে কারোর সুনির্দিষ্ট কিছু প্রশ্ন থাকলে কমেন্ট বক্সে লিখে জানাতে পারেন। কৃতজ্ঞতা জানাই বন্ধু অনিরুদ্ধকে— ও সময় দিয়ে লেখাটি পড়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছে ও কয়েকটি ভুল ঠিক করে নিতে বলেছে।




423 views0 comments

Recent Posts

See All

David Pines and Robert Laughlin introduced a very important concept of physics namely ‘Quantum Protectorate’ through an article with the title ‘The Theory of Everything’ published in 2000. Followed by

bottom of page